
পৃথিবীতে এমন কিছু উদ্ভিদ আছে, যারা নিজেদের পুষ্টির জন্য পোকামাকড়甚至 ক্ষুদ্র প্রাণী শিকার করে। এসব উদ্ভিদের পাতাই রূপান্তরিত হয়ে শিকার ধরার ফাঁদে পরিণত হয়। দেখতে কলসের মতো এই পাতা ফাঁপা থলের আকৃতির, মুখ খোলা এবং মুখে ঢাকনার মতো একটি অংশ থাকে। কলসের ভেতরে থাকে বিশেষ ধরনের জারক রস বা ডাইজেস্টিভ ফ্লুইড। কোনো পোকা কলসের মুখ দিয়ে ভেতরে ঢুকলে ঢাকনাটি বন্ধ হয়ে যায়, ফলে শিকার আর বের হতে পারে না। ধীরে ধীরে সে রসে আটকা পড়ে পোকাটি মারা যায় এবং উদ্ভিদের পুষ্টিতে পরিণত হয়। কলসের ভেতরের নিচের দিকে থাকা বিশেষ গ্রন্থির মাধ্যমে গাছ সেই পুষ্টিরস শোষণ করে নেয়। এ কারণেই এ ধরনের উদ্ভিদকে মাংসভোজী বা পতঙ্গভুক উদ্ভিদ বলা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে Nepenthes গণের কলসগাছ দেখা যায়। এগুলো মূলত বুনো উদ্ভিদ হলেও ব্যতিক্রমী গড়ন ও সৌন্দর্যের কারণে উদ্ভিদ প্রজননবিদেরা নানা হাইব্রিড জাত তৈরি করেছেন। ফলে এখন অনেক উদ্যানে ও বাগানে কলসগাছ শৌখিন উদ্ভিদ হিসেবে শোভা পাচ্ছে। কাতারের দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাচঘেরা ছাদের নিচে থাকা জীবন্ত উদ্যানেও এমন কলসগাছ চোখে পড়ে। ছয় হাজার বর্গমিটারের এই সবুজ বাগানজুড়ে রয়েছে প্রায় ৩০০টি বড় গাছ ও ২৫ হাজারের মতো ছোট-বড় উদ্ভিদ, বসার জায়গা, ভাস্কর্য, ঝরনা ও আলোয় সাজানো শান্ত এক পরিবেশ।
চোখে পড়ার মতো একটি দৃশ্যে দেখা যায়, একটি বৃক্ষের গায়ে ঝুলছে অসংখ্য কলসগাছ। বাংলাদেশেও এ গাছ দেখা যায়—জাতীয় বৃক্ষমেলা কিংবা পূর্ব সিলেটের জঙ্গল, বিশেষ করে জাফলংয়ের কাছে জৈয়ন্তিয়া পাহাড়ের বনে। কলসগাছ গণের উদ্ভিদ বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭০টি প্রজাতির। বাংলাদেশে পাওয়া প্রজাতিটির নাম Nepenthes khasiana, গোত্র নেপেনথেসি। সাধারণত এরা পোকামাকড় শিকার করলেও পৃথিবীর কিছু বড় প্রজাতির কলসগাছ ব্যাঙ বা ছোট পাখির মতো ক্ষুদ্র প্রাণীকেও শিকার করতে সক্ষম।
এই গাছের ইংরেজি নাম পিচার প্ল্যান্ট, অন্য নাম মাঙ্কি কাপস বা পিটফল ট্র্যাপ। পাতার অগ্রভাগ রূপান্তরিত হয়ে কলসের মতো আকার ধারণ করায় বাংলায় একে বলা হয় কলসগাছ বা কলসপাতা। লোকবিশ্বাস আছে, বৃষ্টির পানি জমে থাকা এই কাপে জঙ্গলের বানরেরা পানি পান করে, সেখান থেকেই ‘মাঙ্কি কাপস’ নামের উৎপত্তি। প্রকৃতির এই বিস্ময়কর উদ্ভিদ আজও মানুষকে মুগ্ধ করে তার গড়ন, কৌশল আর জীববৈচিত্র্যের অনন্যতায়।